সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন [gtranslate]
শিরোনাম
রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে: চিফ প্রসিকিউটর ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন রাষ্ট্রপতি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী দেশে বদলে যাচ্ছে জ্বালানি তেলের বাজার, সুযোগ পাচ্ছে বেসরকারি খাত খুলনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক ওমর ফারুকের ইন্তেকাল দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বার্তা নিয়ে জাতিসংঘে যাবেন প্রধানমন্ত্রী : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে: প্রধানমন্ত্রী বিএনপির ইতিহাস ও বাংলাদেশের ইতিহাস প্রায় অভিন্ন : স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আশুলিয়ায় স্ত্রী-সন্তানকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, রামদাসহ স্বামী আটক
Headline
Wellcome to our website...
বিদ্যুৎবিহীন দেশ—জনদুর্ভোগের শেষ কোথায়?
/ ১৭ : টাইম ভিউ
আপডেট : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

আনিস প্রধান  :

ছবিটি উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের। রাত তখন প্রায় ১১টা। একটি ছবিই যেন আজকের নগরজীবনের অনেক না-বলা গল্প বলে দেয়—বিদ্যুৎ আছে, আবার নেই; আলো জ্বলে, আবার অন্ধকার নামে। প্রশ্ন হলো, এই অন্ধকার কি কেবল বিদ্যুৎহীনতার, নাকি এর আড়ালে আরও বড় কোনো সংকটের প্রতিচ্ছবি?
গত ২৪ আগস্ট থেকে ঢাকায় অবস্থান করছি। গত চার দিন এমপি হোস্টেলে ছিলাম। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় একবারও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। জানি না মন্ত্রীপাড়ার বাস্তবতা কী। তবে আজ ঢাকার একটি বিত্তবান আবাসিক এলাকায় এসে গত আট ঘণ্টায় তিনবার বিদ্যুৎ চলে যেতে দেখলাম। প্রতিবার বিদ্যুৎ ফিরতে সময় লেগেছে এক থেকে দেড় ঘণ্টা।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—বিদ্যুৎ সরবরাহের এই বৈষম্যের কারণ কী? শহরের অভিজাত এলাকা, সাধারণ আবাসিক এলাকা এবং গ্রাম—সবখানে কি একই বাস্তবতা? নাকি কোথাও নাগরিক সুবিধার মান ভিন্ন?
গ্রামের মানুষের দুর্ভোগের কথা তো আরও করুণ। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য—সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন আজ যেন প্রতিদিনের এক নতুন পরীক্ষার নাম।
দেশ বহু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন—প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা জড়িয়ে ছিল। জনগণ চেয়েছে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, নিরাপদ জীবন এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি।
মানুষের প্রত্যাশা কখনো খুব বেশি ছিল না। তারা প্রাসাদ চায়নি; চেয়েছে মাথা গোঁজার নিশ্চয়তা। বিলাসিতা চায়নি; চেয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের নাগালের মধ্যে দাম। বিশেষ সুবিধা চায়নি; চেয়েছে আইনের চোখে সমান মর্যাদা।
কিন্তু বাস্তবতা যদি প্রত্যাশার বিপরীত পথে হাঁটে, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
গ্যাস ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নাগরিক সেবার নানা সীমাবদ্ধতা—এসব সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একটি সরকার যতই সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ করুক, সেই পরিকল্পনার সুফল যদি সাধারণ মানুষের ঘরে না পৌঁছে, তাহলে পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
বিশ্বও আজ কঠিন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন—সবকিছুর প্রভাব পড়ছে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা আড়াল করা যায় না। বরং সংকটের সময়েই একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বের বিচক্ষণতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকৃত পরীক্ষা হয়।
আজকের পৃথিবী ৫০ বছর আগের পৃথিবী নয়। তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের হাতে এমন শক্তি তুলে দিয়েছে, যেখানে তথ্য গোপন রাখা কঠিন এবং জনগণের প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। নাগরিক এখন শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না; সে ফলাফল দেখতে চায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসও আমাদের শেখায়, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে কখনো অবহেলা করা যায় না। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, বঞ্চনা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জনগণ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন পরিবর্তনের শক্তি সৃষ্টি হয়।
তাই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ক্ষমতা কোনো স্থায়ী অধিকারও নয়। ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে আসে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছেই তার জবাবদিহি করতে হয়।
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—শাসককে বাস্তবতা বুঝতে হবে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেই কৌশলের ভিত্তি অবশ্যই হতে হবে আইন, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জনগণের স্বার্থ।
শাসককে শুধু শক্তিশালী হলেই হবে না; হতে হবে বিচক্ষণ। শুধু কঠোর হলেই হবে না; হতে হবে ন্যায়পরায়ণ। শুধু জনপ্রিয় হলেই হবে না; হতে হবে জবাবদিহিমূলক।
ইতিহাসের পাতায় ক্ষমতার উত্থান-পতনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনসহ উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের দেখায়—রাজনীতিতে আবেগ, ভুল হিসাব, অতিরিক্ত আস্থাশীলতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে অসচেতনতার মূল্য অনেক সময় একটি রাষ্ট্র বা নেতৃত্বকে অত্যন্ত কঠিন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
আজ তাই প্রশ্নটি কেবল বিদ্যুৎ কেন যাচ্ছে—এতটুকু নয়।
প্রশ্ন হলো, জনগণের জীবনযাত্রা সহজ করার জন্য রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?
প্রশ্ন হলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
প্রশ্ন হলো, বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে প্রশাসন কতটা সক্ষম?
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের নাগরিক সুবিধা কি সবার জন্য সমান?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দূরত্ব কতটা কমছে?
জনগণ কোনো সরকারের শত্রু নয়। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। তাদের ধৈর্যকে দুর্বলতা মনে করা যেমন ভুল, তেমনি তাদের প্রত্যাশাকে অবজ্ঞা করাও আত্মঘাতী।
কারণ ইতিহাসের একটি নির্মম সত্য হলো—জনগণের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন পরিবর্তনের দাবি আর কেবল দাবি থাকে না; তা পরিণত হয় সময়ের অনিবার্য বাস্তবতায়।
তাই এখনই সময় আত্মতুষ্টি পরিহার করে বাস্তবতার দিকে তাকানোর। বিদ্যুতের আলো শুধু ঘরকে আলোকিত করে না; রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা ও সুশাসনের আলোও একটি জাতির ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে।
জনগণ আলো চায়—শুধু বিদ্যুতের আলো নয়, সুশাসনের আলোও।
বিচক্ষণতাই শক্তি, সুশাসনই রাষ্ট্রের ভিত্তি—আর জনগণের আস্থাই ক্ষমতার প্রকৃত শক্তি।
সাধু সাবধান।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
আমাদের পেজে লাইক করুন

Recent Comments

No comments to show.