
আনিস প্রধান, বিশেষ প্রতিনিধি : দীর্ঘ ১৭ বছর—বাংলাদেশের মানচিত্রে সূর্য উঠেছে, অস্ত গেছে; বহমান নদীর মতো জীবনও এগিয়ে গেছে মৃত্যুর দিকে। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা এই দেশটি যেন একসময় ক্ষমতার রাজনীতি, ভয়, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও স্বার্থের বেড়াজালে ক্রমেই ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে নাগরিকের কণ্ঠ যখন ভয়ের কারণে স্তব্ধ হয়ে যায়, প্রতিবাদ যখন অপরাধের তকমা পায়, আর ভিন্নমত প্রকাশের পরিণতি যখন মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হয়রানির আশঙ্কায় পরিণত হয়—তখন রাষ্ট্রের শরীরে শুধু ক্ষত তৈরি হয় না, মানুষের মনেও জন্ম নেয় গভীর হতাশা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন এক পরিস্থিতির অভিযোগ ও আলোচনা ছিল, যেখানে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো আন্দোলন করেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। সাধারণ মানুষও একসময় রাজনীতির সংঘাত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। মুখে যেন অদৃশ্য কলুপ, চারপাশে থমথমে নীরবতা—কথা বললেই কেউ স্বাধীনতাবিরোধী, কেউ রাজাকার, কেউ রাষ্ট্রের শত্রু! ফলে ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েছিল একটি বড় জনগোষ্ঠী। মনে হচ্ছিল, সম্ভাবনার সূর্য বুঝি অস্তমিত; সামনে নেই কোনো আলোর রেখা, নেই কোনো নতুন আশার বার্তা। ঠিক সেই সময় ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল এমন এক প্রজন্মের, যাদের নিয়ে আমরা এতদিন নানা অভিযোগ করেছি। বলা হয়েছে—তারা মোবাইল ছাড়া থাকতে পারে না, মাঠে খেলতে চায় না, বই পড়ার ধৈর্য নেই, সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহ কম, রাত জেগে অনলাইন গেম খেলতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অথচ একটি জ্ঞানমূলক লেখা কয়েক মিনিট মনোযোগ দিয়ে পড়ার ধৈর্যও নেই। অভিভাবকেরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন, কেউ কেউ ভেবেছেন—এই প্রজন্ম দিয়ে দেশটা চলবে কীভাবে? অথচ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস—যে প্রজন্মকে আমরা দুর্বল ভেবেছিলাম, সেই প্রজন্মই একদিন রাষ্ট্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেল। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল তারই সূচনা। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। সংঘাত, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের অভিযোগ আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। একসময় রাজপথে দাঁড়িয়ে যায় হাজার হাজার তরুণ। একজন পড়ে গেলে আরেকজন সামনে আসে, একজন আহত হলে অন্যজন তার জায়গা নেয়। ভয় দেখিয়ে তাদের ঘরে ফেরানো গেল না। বরং প্রতিটি আঘাত যেন তাদের আরও দৃঢ় করে তুলল। প্রথমদিকে সন্তানদের রাজপথে যাওয়ায় যে বাবা-মায়েরা আতঙ্কে রাত কাটিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে তারাই সন্তানের সাহসে সাহস খুঁজে পেয়েছেন। সন্তানের রক্ত ও আত্মত্যাগ অভিভাবকদেরও ঘর থেকে রাজপথের দিকে টেনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই রূপ নেয় ছাত্র-জনতার বৃহত্তর আন্দোলনে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়, আর তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—সবকিছু কি এবার থেমে যাবে? কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ তখন অন্যদিকে। আন্দোলন থামেনি; বরং নতুন গতি পেয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা, সেনাসদস্যদের অবস্থান, জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততায় আন্দোলন পরিণত হয় গণজোয়ারে। অবশেষে আসে ৫ আগস্ট ২০২৪—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নাটকীয় দিন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং জন্ম নেয় নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা। মানুষ ভাবল—এবার হয়তো বদলাবে রাষ্ট্র, বদলাবে রাজনীতি, বদলাবে ক্ষমতার সংস্কৃতি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু হয়েছে আরও কঠিন পরীক্ষা। কারণ একটি সরকারের পতন ঘটানো যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হলো ক্ষমতার পুরোনো সংস্কৃতি পরিবর্তন করা। একটি মুখের পরিবর্তন মানেই রাষ্ট্রের পরিবর্তন নয়; একটি দলের পতন মানেই অন্যায়ের অবসান নয়। পুরোনো সুবিধাভোগী কাঠামো যদি নতুন পোশাকে ফিরে আসে, পুরোনো স্বার্থের রাজনীতি যদি নতুন স্লোগানের আড়ালে মাথা তোলে, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্য কোথায়? আজ তাই প্রশ্ন শুধু একটি দলের কাছে নয়—প্রশ্ন সব রাজনৈতিক শক্তির কাছে। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি—কেউই জনগণের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। যারা জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককেই জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনও শেখ হাসিনাকে ঘিরে নানা ধরনের প্রচারণা দেখা যায়—‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’—এমন বক্তব্যও চোখে পড়ে। এসব প্রচারণা কতটা বাস্তব, কতটা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কিংবা কতটা প্রচার—তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয় তখনই, যখন নতুন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমতে থাকে। তাই নতুন বাংলাদেশকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় উপায় প্রতিশোধ নয়; সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, সুশাসন, জবাবদিহি ও জনগণের আস্থা। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—এই আন্দোলনের অর্জন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যারা ছাত্রদের রক্তকে নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদ বৃদ্ধির সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে, তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি করতেই হবে। যারা জনগণের আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক পুঁজি বানাবে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ জুলাই কোনো দলের একার নয়, কোনো নেতার একার নয়—জুলাই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠার নাম। একটি প্রবাদ আছে—‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।’ পুরোনো অন্যায়কে সরিয়ে যদি নতুন অন্যায় জায়গা করে নেয়, তাহলে পরিবর্তনের অর্থই হারিয়ে যায়। তাই আজ প্রয়োজন সর্বোচ্চ সতর্কতা। যারা পুরোনো ক্ষমতার সঙ্গে ছিলেন, তারা যদি নতুন পরিচয়ে ফিরে আসেন, তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে। যারা নতুন বাংলাদেশের কথা বলে ক্ষমতায় আসবেন, তাদেরও জনগণের সামনে হিসাব দিতে হবে। মানুষ এখন শুধু স্লোগান শুনতে চায় না; মানুষ দেখতে চায় বাস্তব পরিবর্তন। তারা জানতে চায়—দুর্নীতি কমেছে কি না, প্রশাসন নিরপেক্ষ হয়েছে কি না, মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে কি না, সাংবাদিক নিরাপদে কাজ করতে পারছে কি না, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়েছে কি না। জুলাই আমাদের দেখিয়েছে—একটি জাতিকে চিরদিন ভয় দেখিয়ে রাখা যায় না। নীরব মানুষ একদিন কথা বলে, ভীত মানুষ একদিন রাজপথে নামে, আর অবহেলিত তরুণরাই একদিন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতা হবে জনগণের সেবা করার দায়িত্ব, লুটপাটের সুযোগ নয়; রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতা হবে মূল্যায়নের ভিত্তি; সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না; আর কোনো ছাত্রের রক্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষমতার সিঁড়ি হবে না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—জুলাই কি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নাম, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা? সময়ের বিচারেই তার উত্তর মিলবে। তবে একটি কথা আজই বলা যায়—যে তরুণরা বুকের রক্ত দিয়ে পরিবর্তনের দরজা খুলেছে, তাদের আত্মত্যাগ যদি আবার স্বার্থের রাজনীতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই আজকের অঙ্গীকার হোক—জুলাইয়ের রক্ত কোনো ব্যক্তির নয়, কোনো দলের নয়; এই রক্ত বাংলাদেশের মানুষের। আর সেই রক্তের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও পুরো বাংলাদেশের।


