
বিশেষ প্রতিনিধি : মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন বলে রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিশ্চিত করেছে। ১৯৮৯ সাল থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা এই প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।এর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার পাম বিচ থেকে এক বিবৃতিতে খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্প ইরানি জনগণকে ‘নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারের’ আহ্বান জানান।অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, “এটাই আপনাদের সময়—ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করুন।”
তেহরানে আতঙ্ক ও প্রতিক্রিয়াইসরাইলি সূত্রে প্রথম মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের পর তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খামেনির বাসভবনসংলগ্ন এলাকায় বিস্ফোরণের পর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। কয়েক সপ্তাহ আগে দমন করা বিক্ষোভের ক্ষত এখনও শুকায়নি; তার মধ্যেই নতুন করে আঘাত হানল এই হামলা।রোববার ভোরেও রাজধানীতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলার পরপরই ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে।
পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক বিস্তার
খামেনির মৃত্যুর ঘোষণার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। আবুধাবিতে অন্তত দুইজন এবং তেল আবিবে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে জনজীবন।ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, খামেনির শীর্ষ উপদেষ্টা আলি শামখানি ও বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুরও নিহত হয়েছেন। ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন।
উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা
খামেনির বয়স ও স্বাস্থ্য নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। তার মৃত্যুর পর দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি এক বিবৃতিতে বলেন, বিদ্যমান কাঠামোর ভেতর থেকে কোনো উত্তরসূরি এলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি ইরানিদের সতর্ক ও সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।উল্লেখ্য, খামেনি ১৯৮৯ সালে বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি-এর মৃত্যুর পর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
হতাহত ও মানবিক পরিস্থিতিইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্কুলে ভয়াবহ হামলায় ১০৮ জনের প্রাণহানির দাবি করেছে দেশটির বিচার বিভাগ, যদিও স্বাধীনভাবে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইসরাইল ও উপসাগরে সতর্কাবস্থা
ইসরাইলে বাসিন্দারা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিচ্ছেন। তেল আবিব এলাকায় এক নারী নিহত ও প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের রাজধানীতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আবুধাবি ও দুবাইয়ের কিছু এলাকায় আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়।ইরানের বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে—যা বিশ্ব তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। তবে তা কার্যকর হয়েছে কিনা স্পষ্ট নয়।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
হামলার আগে জেনেভায় মার্কিন দূতদের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছিল। বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা না হওয়াকে অভিযানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরে ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক চুক্তি নয়, বরং শাসন পরিবর্তন।ওমান মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিল এবং তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করে হামলা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
নজিরবিহীন সামরিক অভিযান
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিদেশি সরকার উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে এত বড় সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এটি তাদের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিমান হামলা।পরিস্থিতির প্রভাবে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল আকাশপথ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন মধ্যপ্রাচ্যমুখী ফ্লাইট বাতিল করেছে।মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—উভয়ই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।


